নরসিংদী প্রতিনিধি: নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চল চরমধূয়া, যা একসময় ছিল শান্ত ও নিরিবিলি জনপদ—সাম্প্রতিক সময়ে তা রূপ নিয়েছে অস্থিরতা ও আতঙ্কের এলাকায়। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে বলে দাবি স্থানীয়দের। বর্তমানে চরমধূয়া যেন ভয়ের আরেক নাম।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জসিম উদ্দিনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবকে কেন্দ্র করে এলাকায় খুন, হামলা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটসহ নানা অপরাধ বেড়েই চলেছে। একটি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সহিংসতায় অন্তত ৩০টি পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি ইউনিয়নের গাজীপুর গ্রামের রফিকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, এ ঘটনায় জড়িতদের অনুসারীরা প্রতিপক্ষ ও নিরীহ মানুষের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ চালায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা জানান, স্থানীয় শ্রমিক লীগ নেতা আমান উল্লাহ আমান ও তার অনুসারীরা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। তাদের পেছনে রাজনৈতিক ছত্রছায়া রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
অভিযোগ আরও রয়েছে, অস্ত্র সংগ্রহ ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনায় অর্থ জোগানের সঙ্গে জসিম উদ্দিন ও তার ঘনিষ্ঠদের সম্পৃক্ততার কথাও স্থানীয়দের মুখে শোনা যাচ্ছে। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা তা অস্বীকার করেছেন।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার সময় ঘরবাড়ি ভাঙচুর, নগদ অর্থ ও মালামাল লুট, এমনকি নারীদের ওপরও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। নিরাপত্তার অভাবে অনেক পরিবার এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
এক ভুক্তভোগী বলেন, “হঠাৎ করে বাড়িতে হামলা চালিয়ে সবকিছু ভেঙে ফেলে, টাকা-পয়সা লুট করে নিয়ে যায়। আমরা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।”
আরেক ভুক্তভোগী জানান, “গরু-ছাগল, স্বর্ণালংকার সব লুট করে নেওয়ার পর বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। আমরা শুধু নিরাপত্তা আর বিচার চাই।”
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে জসিম উদ্দিন বলেন, চরমধূয়া ইউনিয়নে মূলত দুটি গ্রুপ সক্রিয়—একটি ইউপি চেয়ারম্যান আহসান উল্লাহ শিকদার এবং অন্যটি আমান উল্লাহর নিয়ন্ত্রণে। তার নিজের গ্রামের বাইরে কোনো প্রভাব নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
অভিযুক্ত আমান উল্লাহ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
চরমধূয়া ইউপি চেয়ারম্যান আহসান উল্লাহ শিকদার বলেন, দায়িত্ব পালনের কারণে তিনি বিভিন্ন পক্ষের বিরাগভাজন হতে পারেন, আর সেখান থেকেই তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মজিবর রহমান বলেন, এ ঘটনায় একটি মামলা দায়ের হয়েছে এবং আদালতের নির্দেশনায় তদন্ত চলছে। দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, চরাঞ্চলে কোনো ঘটনা ঘটলে প্রায়ই পক্ষ-বিপক্ষ বিভক্তি তৈরি হয়, যার ফলে এক পক্ষ এলাকায় থাকে এবং অন্য পক্ষ এলাকা ছেড়ে যায়—এ ঘটনাতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
এদিকে, নরসিংদীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন চন্দ্র সরকার জানান, রফিকুল ইসলাম হত্যা মামলায় ইতোমধ্যে দুইজন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং বাকিদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রভাবের ছায়ায় সাধারণ মানুষের ওপর যে সহিংসতা চলছে, তা চরমধূয়ার সার্বিক শান্তি নষ্ট করছে।
এ পরিস্থিতিতে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। পাশাপাশি সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধ করে এলাকায় স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।