নুরুল ইসলাম নূরচান : ২৬ মার্চ আমাদের জাতীয় জীবনের এক অনন্য গৌরবোজ্জ্বল দিন, যা কেবল ক্যালেন্ডারের একটি লাল তারিখ নয় বরং বাঙালি জাতির সহস্র বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার অদম্য সংকল্পের প্রতীক। রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় আত্মত্যাগ, দেশপ্রেম এবং অধিকার আদায়ের এক অবিনাশী বীরত্বগাথা। ১৯৭১ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলার আপামর জনতা পাকিস্তানি শোষকগোষ্ঠীর দীর্ঘ দুই দশকের জুলুম, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সাংস্কৃতিক দমনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। ২৬ মার্চের সেই প্রথম প্রহরে ঘোষিত স্বাধীনতা ছিল বাঙালির দীর্ঘ প্রতীক্ষিত মুক্তির পরোয়ানা, যা নয় মাসের রক্তনদী পেরিয়ে আমাদের উপহার দিয়েছিল একটি স্বাধীন মানচিত্র।
ব্যক্তিগত অনুভূতির জায়গা থেকে বিচার করলে, প্রতি বছর ২৬ মার্চ যখন চারদিকে লাল-সবুজের পতাকায় ছেয়ে যায়, তখন হৃদয়ে এক অদ্ভুত শিহরণ অনুভূত হয়। শহীদ মিনারের বেদিতে রাখা পুষ্পস্তবকের সুবাস আর রাজপথে দেশাত্মবোধক গানের সুর আমাদের স্মৃতির পাতায় নিয়ে যায় একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এই দিনটি আমার কাছে কেবল উৎসবের নয়, বরং গভীর আত্মসমালোচনার। আমরা যে লক্ষ্য নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলাম—সেই সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার কতটুকু অর্জিত হয়েছে, সেটিই আজ বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা যায়, আজকের প্রজন্মের কাছে ২৬ মার্চ মানে প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশপ্রেম ছড়িয়ে দেওয়া এবং তরুণদের কণ্ঠে দৃপ্ত শপথ। এখনকার বিজয় মিছিলে কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যখন শিশুদের হাতে জাতীয় পতাকা দেখি, তখন মনে হয় আমাদের স্বাধীনতার চেতনা আজও অম্লান এবং শক্তিশালী।
গত কয়েক দশকের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি যে অবকাঠামোগত ও অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে, তবে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের জায়গায় এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই এবং অসাম্প্রদায়িক এক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় আজও আমাদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ২৬ মার্চ আমাদের শেখায় কীভাবে শূন্য হাতে লড়ে একটি সার্বভৌম দেশ ছিনিয়ে আনতে হয়। ব্যক্তিগত জীবনে যখনই কোনো বাধার সম্মুখীন হই, তখন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আমাকে অসীম শক্তি জোগায়। হার না মানা মানসিকতা এবং একতার শক্তিই আমাদের শ্রেষ্ঠ অর্জন। এই দিনে শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি আমাদের উচিত নিজেদের কর্মক্ষেত্রে সততা বজায় রাখার অঙ্গীকার করা। কারণ, রক্ত দিয়ে কেনা এই স্বাধীনতাকে রক্ষা করা এবং একটি সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গড়ে তোলাই হোক আমাদের সবার পরম লক্ষ্য। পরিশেষে, ২৬ মার্চ আমাদের অস্তিত্বের মূল ভিত্তি যা আমাদের সম্মুখপানে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেয়। আমাদের প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির হিসাব মেলানোর পাশাপাশি আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার দৃপ্ত শপথ নিতে হবে এই দিনেই।
লেখক : নরসিংদী জেলা শিল্পকলা একাডেমি সম্মাননা - ২০২৩ প্রাপ্ত কবি, কথাসাহিত্যিক ও গীতিকার
সম্পাদক, মাসিক সাহিত্য ম্যাগাজিন 'সময়ের খেয়া'
প্রকাশিত গল্প, উপন্যাস ও কবিতার বই ৮টি।