নুরুল ইসলাম নূরচান : পবিত্র রমজান মাসকে কেন্দ্র করে নরসিংদী জেলার প্রধান বাজারগুলোতে ফলের দামে রীতিমতো আগুন লেগেছে, যা সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেলা শহরের ঐতিহ্যবাহী বড় বাজার, ভেলানগর বাজার, সাটিরপাড়া মোড় এবং রেলবাজারসহ বিভিন্ন খুচরা বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গত কয়েকদিনের ব্যবধানে বিদেশি ও দেশি ফলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে।
এক সময়ের কৃষি ও বাণিজ্য সমৃদ্ধ এই জেলায় এখন আপেল, মাল্টা ও আঙুরের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। প্রতি কেজি মাল্টা এখন বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকায়, আর ভালো মানের আঙুর ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। প্রতি কেজি আনার ৫৫০-৬০০ টাকা। এমনকি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সাগর কলা, পেয়ারা ও বেলের দামও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে, এক কুড়ি চাপা কলা ১০০-১২০। যা মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ইফতারের মেনু সাজানো এক দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছে। ইফতারের টেবিলে একসময় ফলের যে আধিক্য দেখা যেত, বর্তমান চরম বাজার পরিস্থিতিতে সেখানে এখন প্রধান জায়গা করে নিয়েছে সস্তা দামের ছোলা-মুড়ি আর পেঁয়াজু।
বাজারের এই অস্থির পরিস্থিতি নিয়ে ভেলানগর বাজারের খুচরা ফল ব্যবসায়ী আব্দুল বারেক জানান, আড়ত থেকেই তাদের চড়া দামে ফল কিনতে হচ্ছে, যার ফলে খুচরা পর্যায়ে দাম না বাড়িয়ে তাদের কোনো উপায় নেই। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, "আগে মানুষ কেজি মেপে ফল কিনত, এখন অনেকেই এসে ২৫০ গ্রাম বা আধা কেজি নিতে চায়, যা আমাদের ব্যবসায়িক মন্দারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।" অন্যদিকে, বড় বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ীদের দাবি, আমদানিকৃত ফলের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় এলসি জটিলতার কারণে ফলের সরবরাহ কমে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্থানীয় বাজারে। তবে সাধারণ ক্রেতাদের অভিযোগ ভিন্ন। তাদের মতে, স্থানীয় সিন্ডিকেট ও অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ইচ্ছেমতো দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। ইফতারের প্রধান উপকরণ খেজুরের দামও এখন সাধারণের সাধ্যের বাইরে, যেখানে সাধারণ মানের খেজুরও কেজি প্রতি ৩০০ টাকার নিচে মেলা ভার।
এই উচ্চমূল্যের প্রভাবে নরসিংদীর সাধারণ শ্রমজীবী ও নিম্ন-আয়ের পরিবারগুলোর ইফতারের চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। সারাদিন রোজা রাখার পর শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির জোগান দিতে যেখানে ফলের প্রয়োজন ছিল, সেখানে ফলের উচ্চমূল্যের কারণে মানুষ এখন শুধু পেট ভরানোর জন্য ছোলা-মুড়ি আর শরবতেই সন্তুষ্ট থাকছে। সাটিরপাড়া এলাকায় ইফতারি কিনতে আসা এক রিকশাচালক জানান, "এক কেজি আঙুরের দামে পরিবারের দুই দিনের চাল কেনা যায়, তাই ফল কেনার কথা এখন আর চিন্তাও করি না।"
পুষ্টিবিদদের মতে, দীর্ঘ সময় উপবাসের পর শরীরে তাৎক্ষণিক শক্তির জন্য ফলের রস বা তাজা ফল অত্যন্ত কার্যকর, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষ চরম পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিতে পড়ছে। নরসিংদীর সচেতন নাগরিক সমাজ এখন প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছেন যেন দ্রুত বাজার মনিটরিং এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের তৎপরতা বাড়িয়ে এই অসাধু চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, যাতে ইফতারের টেবিলে অন্তত এক টুকরো ফল খাওয়ার সুযোগ সাধারণের সাধ্যের মধ্যে ফিরে আসে।