মুসাফির নজরুল ইসলাম : বাংলা সাহিত্যের বিস্তৃত আঙিনায় যারা প্রচারের চাকচিক্য এড়িয়ে নিভৃতে শব্দের মায়া বুনে চলেন, নুরুল ইসলাম নূরচান তাঁদের মধ্যে এক উজ্জ্বল নাম। দীর্ঘ প্রায় তিন দশকের নিরলস সাহিত্য সাধনায় তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন সংবেদনশীল কথাসাহিত্যিক ও কবি হিসেবে। তাঁর এই সৃজনশীল যাত্রার সূচনা হয়েছিল ১৯৯৭ সালে, যখন তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘এরই নাম জীবন’ প্রকাশিত হয়। প্রথম গ্রন্থেই তিনি জীবনের রূঢ় বাস্তবতা আর মানবিক আবেগের যে মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন, তা পাঠক ও সমালোচক মহলে সমানভাবে সমাদৃত হয়েছিল। সেই থেকে শুরু হওয়া এই কলমযুদ্ধ আজ অবধি সচল রয়েছে, যার ফসল হিসেবে আমরা পেয়েছি গল্প, উপন্যাস, কবিতা ও উক্তিসমগ্র মিলিয়ে মোট আটটি মূল্যবান গ্রন্থ।
নূরচানের সাহিত্যকর্মের দিকে তাকালে দেখা যায়, তাঁর সৃষ্টির মূলে রয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, প্রেম, বিরহ এবং আধ্যাত্মিক চেতনার এক সুনিপুণ প্রকাশ। তাঁর বহুল আলোচিত গ্রন্থ 'বকুলতলা' যেন স্মৃতির আঙিনায় এক চেনা জীবনের আখ্যান। বকুলতলা মানেই তো কেবল একগুচ্ছ ঝরে পড়া ফুল নয়, বরং একরাশ দীর্ঘশ্বাস আর হারানো প্রেমের মৌন সাক্ষী। অন্যদিকে, 'বাইশে মাঘ' গ্রন্থে তিনি শীতের রিক্ততায় তপ্ত জীবনের এক অনন্য আখ্যান ফুটিয়ে তুলেছেন। মাঘের শেষ লগ্নে প্রকৃতিতে যে রিক্ততা বিরাজ করে, লেখক সেখানে মানুষের হৃদয়ের না বলা দীর্ঘশ্বাসগুলোকে মূর্ত করে তুলেছেন। তাঁর অন্যান্য সৃষ্টি যেমন ‘চেনা পৃথিবী অচেনা মানুষ’, ‘হঠাৎ একদিন’ কিংবা ‘অবশেষে’—প্রতিটি গ্রন্থের কাহিনির ভেতরে রয়েছে জীবনের গূঢ় সত্য।
সাহিত্যে এই একনিষ্ঠ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ নুরুল ইসলাম নূরচান ২০১০ সালে অর্জন করেন ‘বাংলাদেশ কবি সংসদ সাহিত্য পুরস্কার’ এবং ‘কবি খান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন সাহিত্য পুরস্কার’। অতি সম্প্রতি ২০২৩ সালে নিজ জেলা থেকে প্রাপ্ত ‘নরসিংদী জেলা শিল্পকলা একাডেমি সম্মাননা’ তাঁর কর্মময় জীবনের মুকুটে আরও একটি সাফল্যের পালক যুক্ত করেছে। ১৯৯৭ থেকে বর্তমান—এই সুদীর্ঘ সময়ের পথপরিক্রমায় তিনি জাতীয় এবং স্থানীয় বিভিন্ন খ্যাতনামা পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত লিখে চলেছেন। তাঁর গদ্যের ভাষা যেমন সাবলীল, তেমনি বিষয়ের গভীরতা পাঠককে শেষ পর্যন্ত আবিষ্ট করে রাখে। বাংলা সাহিত্যের এই নিরলস সাধকের কলম সচল থাকুক এবং আমাদের আরও সমৃদ্ধ সাহিত্য উপহার দিক—এটাই কাম্য।