• নরসিংদী
  • সোমবার, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২৫ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

Advertise your products here

Advertise your products here

নরসিংদী  সোমবার, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ;   ২৫ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
website logo

গল্প : ভাগে কোরবানি-- নুরুল ইসলাম নূরচান 


জাগো নরসিংদী 24 ; প্রকাশিত: রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১০:৪১ পিএম
গল্প : ভাগে কোরবানি-- নুরুল ইসলাম নূরচান 

 

ঢাকার ব্যস্ত শহর। সায়দাবাদ বাসস্ট্যান্ডের ধুলোবালি আর ইঞ্জিনের আর্তনাদে কান পাতা দায়। এর মাঝেই আতিক হাসান দাঁড়িয়ে আছেন একটা বাস ধরার অপেক্ষায়। হাতে বাজারের পুরোনো ব্যাগটা, যার ভেতরে খবরের কাগজে মোড়ানো বিশ হাজার টাকার বান্ডিল। এই টাকাটা কেবল কয়েকটা নোট নয়; গত চার মাস আতিকের প্রতিটি সকালের চা না খাওয়া, দুপুরে সস্তায় পেট ভরানো আর বিকেলের সিগারেটটা ছেড়ে দেওয়ার এক দীর্ঘ সমষ্টি। সে ঢাকার ফুটপাতে ছোট একটি ব্যবসা করে। 

​নরসিংদীর ছোট গ্রামটাতে তার সংসার। বৃদ্ধ বাবা-মা, যারা প্রতিটা ঈদে চেয়ে দেখেন প্রতিবেশীদের বাড়িতে কুরবানির মাংসের ধোঁয়া উঠছে কি না। স্ত্রী, যে সংসারের টানাপড়েনে নিজের শখগুলো অনেক আগেই বিসর্জন দিয়েছে। আর তিন সন্তান—যাদের কাছে কুরবানি মানেই নতুন জামা আর তৃপ্তিভরে গরুর মাংস খাওয়া।

​গত কয়েকটা বছর আতিকের জন্য ছিল এক অমানবিক যুদ্ধ। সংসারের খরচ বাড়ছিল, আর আতিকের ছোট ব্যবসার আয় যেন সেই স্রোতের সাথে পাল্লা দিতে হিমশিম খাচ্ছিল। প্রতি বছর কুরবানির সময় তিনি যখন খালি হাতে গ্রামে ফিরতেন, তখন নিজের মায়ের চোখে যে করুণা আর সন্তানদের চোখে যে তৃষ্ণার্ত চাহনি দেখতেন, তাতে তার বুকটা দুমড়ে-মুচড়ে যেত।

​"বাবা, এবার কিন্তু কথা দিতে হবে, কুরবানি দিতেই হবে। মাইনসের বাইত্তে যেই মাংস দেয়, তা খাইয়া মন ভরে না,"—ঈদের দুই মাস আগে ছোট মেয়ের এই আবদারটা আতিকের হৃদয়ে শেল হয়ে বিঁধেছিল। সেই জেদ থেকেই তার এই প্রাণান্ত চেষ্টা।

​বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আতিক ঘড়ি দেখলেন। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। হঠাৎই চারপাশটা যেন অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল। চার-পাঁচজন যুবক আতিকের চারপাশ ঘিরে ধরল। ধারালো অস্ত্রের ঝিলিক তার চোখের সামনে। ভয়ে গলা শুকিয়ে এলো আতিকের।

​"যা আছে সব বের কর, নয়তো লাশ হয়ে যাবি!"—হুমকি শুনে আতিক থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে সেই বিশ হাজার টাকা বের করে দিলেন। এটি তার সন্তানদের ঈদের খুশি, মায়ের মুখের হাসি আর বাবার সম্মান—সবকিছুর মূল্যে কেনা সম্পদ।

​হঠাৎ আতিক চিৎকার করে উঠলেন, "ভাই, এই টাকাটা নিবেন না। এটা আমার কুরবানির টাকা। আমার ছোট বাচ্চাগুলো কত আশা করে আছে... আপনারা ঘড়ি- মোবাইল নিয়ে যান, শুধু কুরবানির টাকাটা রাখুন।"

​কিন্তু মানুষের বুকের ভেতরে থাকা পাষাণ গলে না। টাকাগুলো কেড়ে নিয়ে তারা ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল। আতিক দৌড়াতে গিয়েও পারলেন না, পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে যাচ্ছে। চারপাশ থেকে শত শত মানুষ দেখছে। একটু দূরেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজন সদস্য দাঁড়িয়ে ছিলেন, তারা যেন অন্য কোনো গ্রহের বাসিন্দা, নির্লিপ্ত তাদের চাহনি।

​আতিক কাঁদতে কাঁদতে পুলিশের কাছে গিয়ে পড়লেন। "স্যার, ওই যে ছিনতাইকারীরা চলে গেল! আমার বিশ হাজার টাকা... এই টাকায় কুরবানি দেওয়ার কথা ছিল। আপনারা দয়া করে কিছু করুন!"

​এক পুলিশ সদস্য অবজ্ঞার হাসি হেসে বললেন, "আরে মিয়া, এখন কী করব? যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। যান, বাসায় গিয়ে মাথা ঠান্ডা করেন। কুরবানি না দিলে কি আর জীবন থেমে থাকে? গরুর মাংস না খেলে কেউ মরে না।"

​আতিকের মনে হলো, আকাশটা বুঝি তার ওপর ভেঙে পড়ছে। কুরবানি না দিলে কেউ মরে না—কথাটা সত্য, কিন্তু একটা মানুষের আশা যখন খুন হয়, তখন কি সে বেঁচে থাকে?

​নরসিংদীর বাড়িতে পৌঁছাতে রাত হলো। আতিকের মনটা শ্মশানের মতো অন্ধকার। বাড়ির উঠোনে পৌঁছাতেই ছোট ছেলে দৌড়ে এলো, "বাবা, গরু কই? আমরা কিন্তু অনেক আশা করে আছি।"

​আতিকের স্ত্রী দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, তার চোখেও অনাগত মাংস রান্নার স্বপ্ন। আতিক কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। শুধু ব্যাগটা ছুঁড়ে ফেলে অন্ধকার বারান্দায় গিয়ে বসলেন। তার বৃদ্ধ বাবা পাশে এসে দাঁড়ালেন, কোনো কথা বললেন না, শুধু ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন।

​রাতে খাবার টেবিলে ডাল-ভাতের সাথে ভাজি। ছেলেটা আবার জিজ্ঞেস করল, "বাবা, কুরবানি তো দিতে পারলা না, পরের ঈদে দিবা তো?"

​আতিক জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলেন, যেখানে প্রতিবেশীদের বাড়ির কুরবানির মাংসের গন্ধ বাতাসে ভেসে আসছে। তিনি শান্ত স্বরে বললেন, "কুরবানি শুধু পশু জবাই করা নয় রে বাবা, কুরবানি হচ্ছে নিজের সবটুকু দিয়ে অন্যের মুখে হাসি ফোটানো। আজ আমি সব খুইয়েছি, কিন্তু আমার বিশ্বাসটা এখনো আছে।"

​আতিকের চোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। এই জলে কোনো কুরবানির তৃপ্তি ছিল না, ছিল এক হার না মানা মানুষের পরাজয়ের গল্প। সেদিন নরসিংদীর ওই ছোট্ট ঘরে মাংস রান্না হয়নি, কিন্তু সেদিন আতিকের পরিবার বুঝতে পেরেছিল—পৃথিবীতে মাংসের চেয়েও অনেক বেশি প্রয়োজন মানুষের বিবেক আর সহমর্মিতা, যা আজ সায়দাবাদের রাস্তায় সস্তায় বিক্রি হয়ে গেছে।

​আতিকের হৃদয়ে সেই ক্ষতটা রয়ে গেল—যে ক্ষত কেবল এক কোরবানি নয়, বরং একটি আদর্শের বলিদানে তৈরি হয়েছিল।

সাহিত্য বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ