• নরসিংদী
  • শনিবার, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

Advertise your products here

Advertise your products here

নরসিংদী  শনিবার, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ;   ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
website logo

বিংশ শতাব্দীর আলোকবর্তিকা: ডা. লুৎফর রহমানের সাহিত্যদর্শন ও জীবনবোধ


জাগো নরসিংদী 24 ; প্রকাশিত: বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১২:৫৯ এএম
বিংশ শতাব্দীর আলোকবর্তিকা: ডা. লুৎফর রহমানের সাহিত্যদর্শন ও জীবনবোধ

নুরুল ইসলাম নূরচান : ​বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাঙালি মুসলিম সমাজ যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন কুসংস্কার, স্থবিরতা এবং হীনম্মন্যতায় নিমজ্জিত ছিল, ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো আবির্ভূত হয়েছিলেন ডাক্তার লুৎফর রহমান। ১৮৮৯ সালে মাগুরা জেলায় জন্ম নেওয়া এই মহৎ প্রাণ মানুষটি কেবল একজন চিকিৎসক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন ক্ষয়ে যাওয়া সমাজের ‘হৃদরোগের’ চিকিৎসক। তার সাহিত্যদর্শন কেবল শিল্পতৃষ্ণা মেটানোর মাধ্যম ছিল না, বরং তা ছিল একটি জাতির নৈতিক মেরুদণ্ড সোজা করার এক বলিষ্ঠ ইশতেহার। সমকালীন সাহিত্যিকরা যখন রোমান্টিকতা কিংবা অলৌকিকতায় মগ্ন ছিলেন, ডাক্তার লুৎফর রহমান তখন অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে প্রচার করেছেন বিশুদ্ধ মানবতাবাদ এবং যুক্তিবাদ।

​ডাক্তার লুৎফর রহমানের সাহিত্যদর্শনের মূলে ছিল মানুষের আত্মমর্যাদা এবং চরিত্রের জয়গান। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার মনুষ্যত্বে, তার আভিজাত্যে নয়। তার লেখনীর ভাষা ছিল অত্যন্ত প্রাঞ্জল, সহজবোধ্য এবং সরাসরি হৃদয়ে গেঁথে যাওয়ার মতো। তিনি চেয়েছিলেন প্রতিটি মানুষ যেন নিজেকে চিনতে পারে এবং নিজের ভেতরের সুপ্ত সম্ভাবনাকে জাগ্রত করতে পারে। সাম্প্রদায়িকতার উর্ধ্বে উঠে তিনি ঘোষণা করেছিলেন বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বের বাণী। বিশেষ করে তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে নারী শিক্ষা এবং নারীর অধিকার রক্ষায় তিনি যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন, তা আজও বিস্ময়কর। ‘নারীতীর্থ’ সেবা প্রতিষ্ঠান এবং ‘শান্তি’ পত্রিকা সম্পাদনার মাধ্যমে তিনি সমাজ সংস্কারের যে বীজ বপন করেছিলেন, তার প্রতিটি পাতায় মিশে ছিল মুক্তির আকুলতা।

​তার সাহিত্যকর্মের দিকে তাকালে আমরা এক অনন্য জীবনবোধের সন্ধান পাই। তার কালজয়ী গ্রন্থ ‘উন্নত জীবন’ বাঙালি পাঠকদের কাছে এক অবশ্যপাঠ্য জীবনদর্শন হিসেবে স্বীকৃত। ১৯১৯ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে নিয়মানুবর্তিতা, পরিচ্ছন্ন চিন্তা এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে একজন অতি সাধারণ মানুষও শ্রেষ্ঠত্বের শিখরে আরোহণ করতে পারে। তিনি মনে করতেন, বিত্ত-বৈভব নয়, বরং উন্নত রুচি এবং চরিত্রই হলো জীবনের আসল সার্থকতা। তার পরবর্তী উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘মহাজীবন’-এ তিনি মহৎ মানুষের গুণাবলি এবং সফলতার প্রকৃত সংজ্ঞাকে বিশ্লেষণ করেছেন। সফল হতে হলে যে কেবল জাগতিক সম্পদ নয়, বরং হৃদয়ের প্রসারতা প্রয়োজন—সে কথাই তিনি বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

​ডাক্তার লুৎফর রহমানের ‘মানব জীবন’ গ্রন্থে বিধৃত হয়েছে সামাজিক ও পারিবারিক দায়বদ্ধতার কথা। প্রতিটি মানুষের অন্যের প্রতি যে গভীর দায়িত্ব রয়েছে, সেই নৈতিক পাঠ তিনি দিয়েছেন অতি সহজে। যুবসমাজের অবক্ষয় রোধে তার ‘যুবক জীবন’ বইটি আজও এক অনুপ্রেরণার উৎস। তরুণ প্রজন্মকে অলসতা ও হতাশা ঝেড়ে ফেলে কর্মঠ ও সৃষ্টিশীল হওয়ার যে উদাত্ত আহ্বান তিনি জানিয়েছিলেন, তা বর্তমান ডিজিটাল যুগেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। কেবল প্রবন্ধের মাধ্যমেই নয়, উপন্যাসের আঙিনাতেও তিনি ছিলেন সমান সাবলীল। তার ‘পথহারা’ ও ‘রায়হান’ উপন্যাসের পরতে পরতে মিশে আছে সমাজ পরিবর্তনের আকুলতা। গল্পের ছলে তিনি সমাজকে দেখিয়েছেন কোথায় আমাদের ক্ষত আর কীভাবে সম্ভব তার প্রতিকার। এছাড়া তার ‘কবিতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থেও ফুটে উঠেছে স্রষ্টা এবং সৃষ্টির প্রতি নিবিড় মমত্ববোধ।

​১৯৩৬ সালে মাত্র ৪৭ বছর বয়সে এই মহান সাধকের জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু এই স্বল্পায়ু জীবনে তিনি যে বিশাল কর্মযজ্ঞ রেখে গেছেন, তা বাঙালি জাতির এক অমূল্য সম্পদ। ডাক্তার লুৎফর রহমান আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে মেরুদণ্ড সোজা করে বাঁচতে হয়, কীভাবে অন্ধকারকে ভয় না পেয়ে আলোর পথে যাত্রা করতে হয়। আধুনিক বিশ্বের প্রতিযোগিতামূলক জীবনে যখন মানুষ দিশেহারা, তখন তার সাহিত্যদর্শন আমাদের হৃদয়ে সাহসের সঞ্চার করে। জাতীয় জাগরণ এবং সুস্থ সমাজ গঠনে ডাক্তার লুৎফর রহমানের জীবনমুখী সাহিত্য আজও আমাদের পথ দেখায়। এই মহান আলোকবর্তিকার আদর্শকে পাথেয় করে আমরা যদি একটি মানবিক ও রুচিশীল সমাজ গড়তে পারি, তবেই তার প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে।

লেখক : কবি ও কথাসাহিত্যিক

 

সাহিত্য বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ