একটা ঘর। যেখানে একটা মেয়ে বড় হয় বাবার আদরে। স্বপ্ন দেখে নিজের সংসার হবে ভালোবাসার। কিন্তু বিয়ের পর সেই ঘরটাই যদি তার জন্য আতঙ্কের হয়ে যায়? দোষ না করেও যদি তাকে শারীরিক ও মানসিক কষ্ট সহ্য করতে হয়?
আমাদের চারপাশে এমন ঘটনা অহরহ। পত্রিকার পাতায় প্রায়ই দেখি কোনো না কোনো গৃহবধূ নির্যাতনের শিকার। কখনো স্বামীর হাতে, কখনো পরিবারের অন্য সদস্যের হাতে। প্রতিবাদ করতে গেলে শুনতে হয়, "মানিয়ে নাও, সংসার টিকাতে হয়।"
*প্রশ্ন হলো, মানিয়ে নেওয়ার নামে একজন মানুষের আত্মসম্মান কতদিন বিসর্জন দেওয়া যায়?*
ইসলাম ধর্মে বলা হয়েছে, "তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।" আমাদের সংবিধানের ২৮(২) অনুচ্ছেদে বলা আছে, "রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকার"। তাহলে এই বৈষম্য কেন?
*আইন কিন্তু নীরব নয়।* বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩২৩ ধারায় যেকোনো মানুষকে আঘাত করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন, ২০১০ এ স্ত্রীকে শারীরিক-মানসিক নির্যাতন থেকে সুরক্ষার স্পষ্ট বিধান আছে। সমস্যা আইনে না, সমস্যা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে।
*আমরা কোথায় পিছিয়ে আছি?*
*১. সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি:* আমরা অনেকেই মনে করি স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া "ব্যক্তিগত বিষয়"। কিন্তু হাত তোলা আর ঝগড়া এক না। হাত তোলা অপরাধ।
*২. নীরবতা:* পাশের বাড়িতে একজন মা-বোন মার খাচ্ছে শুনেও আমরা দরজা বন্ধ করে রাখি। ভাবি, "ওদের পারিবারিক ব্যাপার"। এই নীরবতাই অপরাধীকে সাহস যোগায়।
*৩. অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা:* অনেক নারী শুধুমাত্র কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই বলে দিনের পর দিন নির্যাতন সহ্য করেন।
*সমাধান কী? ঘর থেকে শুরু করতে হবে।*
*১. পরিবার থেকে শিক্ষা:* প্রতিটা ছেলেকে ছোটবেলা থেকে শেখাতে হবে - "মা-বোনের মতো সব নারীই সম্মানের। গায়ে হাত তোলা পুরুষত্ব না, কাপুরুষতা।" আর প্রতিটা মেয়েকে শেখাতে হবে - "তুমি কারো দয়ার পাত্রী না। অন্যায়ের প্রতিবাদ করা তোমার অধিকার।"
*২. রাষ্ট্রীয় সহায়তা জোরদার:* প্রতিটি উপজেলায় ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারগুলোকে আরও সক্রিয় করতে হবে। ১০৯ নম্বরে কল করলে যেন তাৎক্ষণিক সাড়া পাওয়া যায়। পুলিশকে আরও সংবেদনশীল হতে হবে।
*৩. অর্থনৈতিক মুক্তি:* নারীদের কারিগরি প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ আরও বাড়াতে হবে। একজন নারী যখন নিজের পায়ে দাঁড়াবে, তখন কেউ তাকে অবহেলা করার সাহস পাবে না।
আমি একজন ভাই। আমারও বোন আছে। আমি চাই না আমার বোনের চোখে কখনো ভয় দেখি। আমি চাই না কারো বোন, কারো মেয়ে রাতে ঘুমাতে না পেরে কাঁদে।
একটা কথা মনে রাখবেন। যে ঘরে মা-বোনের চোখের পানি পড়ে, সে ঘরে কখনো বরকত আসে না। আর যে সমাজ নারীকে নিরাপত্তা দিতে পারে না, সে সমাজ কখনোই সভ্য হতে পারে না।
আসুন, আমরা প্রতিজ্ঞা করি। নিজের ঘর থেকে শুরু করি। নিজের বোনকে, নিজের স্ত্রীকে, নিজের মেয়েকে সর্বোচ্চ সম্মান দিই। কারণ একজন নারীর নিরাপত্তা মানেই একটা পরিবারের নিরাপত্তা। একটা পরিবারের নিরাপত্তা মানেই একটা দেশের নিরাপত্তা।
লেখক : শিক্ষার্থী, একাদশ শ্রেণি, নিজামপুর সরকারি কলেজ, চট্টগ্রাম।